গত ১ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখে ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) কার্যক্রম চালু হওয়ার পর অনেক মোবাইল ফোন ব্যবহারকারী নেটওয়ার্কে সংযোগ সমস্যার মুখে পড়ছেন। এছাড়া মোবাইল ব্যবহারকারীরা জানিয়েছে যে, তাদের জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি)-এর সঙ্গে অস্বাভাবিক সংখ্যার মোবাইল ফোন বা আইএমইআই নম্বর যুক্ত দেখাচ্ছে। অসংখ্য ব্যবহারকারী একই ধরনের সমস্যার মুখে পড়ছেন বলে অভিযোগ করেছে মোবাইল অপারেটর।
সেই উদ্দেশ্য বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মো. এমদাদ উল বারী ডেইলি স্টারকে জানিয়েছে, এসব সমস্যা সমাধানের জন্য একটি কারিগরি দল কাজ করছে।
তিনি আরও জানান, মূলত দুইটি কারণে নেটওয়ার্কে সংযোগ সমস্যা দেখা দিয়েছে। প্রথমত, কোনো ব্যক্তির নামে ১০টির বেশি সিম থাকলে তা বাতিলের শেষ সময় ছিল ৩১ ডিসেম্বর। এ ধরনের প্রায় ৯০ লাখ সিম শনাক্ত করা হয়েছিল, যার মধ্যে প্রায় ৮০ লাখ সিম ইতোমধ্যে বাতিল করা হয়েছে। বাকি প্রায় ১০ লাখ সিম বর্তমানে নিষ্ক্রিয় করার প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
দ্বিতীয়ত, একই আইএমইআই নম্বরে বিপুল সংখ্যক হ্যান্ডসেট নিবন্ধিত পাওয়া গেছে। এ কারণে ওই আইএমইআই ব্যবহার করে নতুন সংযোগগুলো সিস্টেম থেকে সাময়িকভাবে ব্লক করা হয়েছে। তবে শীঘ্রই এসব সমস্যার সমাধান পাওয়া যাবে বলে জানিয়েছেন মেজর জেনারেল (অব.) মো. এমদাদ উল বারী।
এনআইডির বিপরীতে অতিরিক্ত ডিভাইস
এনইআইআর চালুর পর অনেক ব্যবহারকারী অভিযোগ করেছেন যে, তাদের জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) বিপরীতে অস্বাভাবিক সংখ্যক হ্যান্ডসেট নিবন্ধিত দেখাচ্ছে। এমনই এক ব্যবহারকারী জানান, তার এনআইডির বিপরীতে ২১২টি হ্যান্ডসেট বা আইএমইআই নম্বর দেখা যাচ্ছে, কিন্তু তিনি বর্তমানে মাত্র দুটি ফোন ব্যবহার করছেন।
বিষয়টি নিয়ে গতকাল শুক্রবার দুপুরে এক ফেসবুক পোস্টে টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেন, বিটিআরসি এবং মোবাইল অপারেটররা যৌথভাবে এই সমস্যা নিয়ে কাজ করছে। ধীরে ধীরে হিস্টোরিক ডেটা ব্যাকগ্রাউন্ডে আর্কাইভ করে শুধুমাত্র বর্তমানে সচল হ্যান্ডসেটের সংখ্যা দেখানো হবে। তবে এই কাজ সম্পূর্ণ হতে আমাদের কিছুটা সময় লাগবে।
ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব-এর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এনইআইআর চালুর পর ক্লোন ফোন নিয়ে ভয়াবহ তথ্য সামনে এসেছে। বর্তমানে নেটওয়ার্কে লক্ষ লক্ষ ভুয়া আইএমইআই নম্বর সক্রিয় রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, 1111111111111, 0000000000000, 9999999999999 সহ এ ধরনের মিল থাকা নম্বরগুলো। তবে এখন এসব আইএমইআই নম্বর ব্লক করা হবেনা, কারণ লক্ষ লক্ষ গ্রাহক এখনো নিম্নমানের নকল মোবাইল ফোন ব্যবহার করছে।
গত ১০ বছরে শুধুমাত্র একটি আইএমইআই নম্বর 99999999999999 ব্যবহার করে মোট ৩ কোটি ৯১ লক্ষ ২২ হাজার ৫৩৪টি রেকর্ড পাওয়া গেছে। এগুলো বিভিন্ন কম্বিনেশনে (Document ID + MSISDN + IMEI) রেকর্ড করা আছে।
এ ধরনের আইএমইআই শুধু স্মার্টফোনেই নয়, বিভিন্ন IOT ডিভাইসেও থাকতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, CCTV বা অন্যান্য ডিভাইস হয়ত একই আইএমইআই নম্বরে রেজিস্ট্রেশন করা হয়েছে। তিনি জানান, বৈধভাবে আমদানি করা IOT ডিভাইসগুলোকে আলাদা করে ট্যাগ করার কাজ ইতোমধ্যেই শুরু করা হয়েছে।
শীর্ষ কিছু আইএমইআই নম্বরের তালিকা অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে, সেগুলোর মধ্যে অনেক ডিভাইস ডুপ্লিকেট হিসেবে রেজিস্ট্রেশন করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ—
- 440015202000 নম্বরে সাড়ে ১৯ লাখ।
- 35227301738634 নম্বরে সাড়ে ১৭ লাখ।
- 35275101952326 নম্বরে সোয়া ১৫ লাখ।
শুধুমাত্র ১ ডিজিটের শূন্য থাকা আইএমইআই নম্বরে রয়েছে ৫ লাখ ৮৬ হাজার ৩৩১টি ডিভাইস।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৪ সালে একটি প্রতিবেদনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৭৩ শতাংশ ডিজিটাল জালিয়াতি ঘটে অনিবন্ধিত ডিভাইসে। এছাড়া বিটিআরসি ও এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলোর যৌথ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে e-KYC জালিয়াতির ৮৫ শতাংশ ঘটেছিল অবৈধ বা মূল আইএমইআই পরিবর্তন করা হ্যান্ডসেট ব্যবহারে। তবে ২০২৩ সালে মোট ১.৮ লাখ ফোন চুরির রিপোর্ট করা হয়েছে, যদিও আরও কয়েক লাখ ফোন চুরির রিপোর্ট করা যায়নি এবং চুরি হওয়া ফোনের অধিকাংশই উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
বাংলাদেশের নাগরিকদের কাছে আন-অফিশিয়াল বা নতুন ফোনের নামে নকল ফোন বিক্রি করা হয়েছে, যা এক ধরনের অভাবনীয় এবং নজিরবিহীন প্রতারণা। এই চক্রকে এখন বন্ধ করা জরুরি।
সোর্স: বিটিআরসি